শেষ প্রহরের বিষণ্নতা.../valobasar golpo

valobasar golpo


বিষণ্নতা অথবা শেষ প্রহরের গল্প -মুনতাসির রাহাত শততমবারের মত বিশাল একটা ম্যাসেজ লিখে ব্যাকস্পেস চেপে ধরে রাহাত ।
নেশা লাগা দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে রিমির নামের পাশের সবুজ বৃত্তটার দিকে ।
বৃত্তটা উধাও হয়ে যায় কিছুক্ষনের মাঝেই , তখনও নেশাটা কাটেনা ওর ।
নেশাটা বড্ড যন্ত্রনা দিচ্ছে আজকাল ।
সামান্য একটা চোখের দেখা থেকে বাচ্চা টাইপের একটা মেয়ের উপরে এত বড় একটা নেশা কল্পনাও করেনি সে !
কিছুক্ষন ওভাবেই বসে থাকা , তারপর ল্যাপটপের ডালা লাগিয়ে উঠে চলে আসা হুট করেই ।
গায়ে একটা চাদর জড়িয়ে বাইরে এসে দাঁড়ায় রাহাত।
ভীষণ শীত পড়েছে ইট,কাঠ,পাথরের এই শহরে । শীতের স্বভাবজাত বিষণ্নতাটুকুও আজকাল স্পর্শ করেনা ওকে ।
অথচ কবিতা লেখার জন্য শীতের বিষণ্নতা একসময় খুব পছন্দের সাবজেক্ট ছিলো ওর !
লিখতে ভীষন পছন্দ করা ছেলেটার মাথা এখন ফাঁকা হয়ে থাকে একদম !
ল্যাপটপের ডালা জোরের সাথে বন্ধ করে উঠে বারান্দায় দাঁড়ানো , দৈনন্দিন এই রুটিনটার পরিবর্তন হয়না অনেকদিন ।
অথচ এই দৈনন্দিন রুটিনটাই ওর স্বাভাবিক, উড়ন্ত, ভীষণ তীব্রতার এক জীবনে কতবড় ওলটপালট এনেছে, মেয়েটা কি তা জানে ? জানেনা নিশ্চয় ... অথচ শুরুটা অস্বাভাবিক ছিলনা খুব একটা ।
ভার্সিটি শুরুর দিনগুলোতে ডিপার্টমেন্টের তিন ল্যান্ডিং এর সিঁড়ির দ্বিতীয় ল্যান্ডিং এ যেদিন মেয়েটার সাথে হুট করে দেখা হলো , সামান্য কিছু কথা আর রুমে এসে স্টুডেন্ট লিস্ট থেকে নাম বের করে ফেসবুকে একটা রিকুয়েস্ট পাঠানো ছাড়া খুব বেশি কিছুই হয়নি সেদিন ! শুধু সেদিন না , সেদিনের পর অনেকগুলো দিন কেটে গেছে খুব নিস্পৃহ ভাবে ।
ভীষণ ব্যস্ত , নিস্পৃহ সেইসব দিনে নিজের অজান্তেই রিমির নামটা বুকের বাম পাশটায় কখন বসতে শুরু করেছে , বুঝতেও পারেনি রাহাত।
ক্লাসরুম আলাদা ছিল , দেখাও হতোনা খুব একটা , দেখেছিল মাঝখানে একবার ।
ফার্স্ট ইয়ারদের জন্য যাওয়া বাধ্যতামূলক এরকম একটা মিছিলের পাশ দিয়ে যেদিন চলে গেছিলো রিমি সেইদিন ।
মুখ চোখ কাল করে কি ভয়টায় না পেয়েছিলো মেয়েটা , মনে পড়তেই ঠোঁটের পাশের সূক্ষ হাসিটা আটকাতে পারেনা রাহাত!
সেই ভীত চোখের মেয়েটা রাহাতের কাছে নেশার মত হয়ে গেছে ধীরে ধীরে ।
তীব্র শীতের এক বিকেলে নাম না জানা কোনো নদীর ধার দিয়ে তার হাত ধরে হাঁটছে এরকম একটা স্বপ্ন রাহাত প্রায় দেখতো ।
প্রায় বাস্তব সেসব স্বপ্নে সুখ সুখ ভাবটা এত প্রবল ভাবে থাকতো , রাহাত অনিয়মের চূড়ান্তে যেয়েও , নিয়ম করে অপেক্ষা করত স্বপ্ন গুলোর জন্য কিংবা কে জানে সেই সুখ সুখ ভাবটার জন্য... সেই দ্বিতীয় দেখার পর অনেকগুলো দিন পার হয়ে গেছে ।
এর মাঝে শুধু একদিন খুব কাছের এক বান্ধবীকে রিমির ছবি দেখিয়ে সে বলেছিল , মেয়েটা কিন্তু খুব কিউট!
বান্ধবীটা ধরে ফেলছিল চট করে , ক্রাশ খাইস             নিশ্চয় !
না , না প্রশ্নই আসেনা এত দৃঢ়তার সাথে বান্ধবীকে নাকি নিজেকেই ফাঁকি দিয়েছিল রাহাত কে জানে !
বুকের বাম পাশে বসতে থাকা নামটা ভাবিয়েছিল ধীরে ধীরে , পাত্তা দেয়ার সময় রাহাত কখনোই পেতনা ! হলে থাকার উড়ন্ত দিনগুলোতে সময় আটকে থাকেনা কোনোভাবেই !
তখন ব্যস্ততাটুকুর পুরোটা জুড়ে কেবল নিজের পৃথিবীটাই ছিল , সেই পৃথিবীটা জুড়ে একসময় কেবল মেয়েটা থাকবে সেটাও কি রাহাত ভেবেছিল!
সেমিস্টারের শেষ দিকে এসে ক্লাস,ল্যাব টেস্ট,কুইজ সবকিছুর শেষে প্রায় ২ মাস পর যখন পরীক্ষার আগের বন্ধটা শুরু হয়েছিল , আর দশজনের মতই ক্লান্ত ছিল রাহাতও।
বাসায় এসে খালি ঘুমিয়েই ছিল প্রায় দুই দিন ।
কে জানতো সেই ভীষণ ক্লান্তির শেষে পুরোনো লেখালেখির ভূতটা মাথায় চাপবে ।
আরো অনেকগুলো বারেরমত এইবারও মনে হয়েছিল , দ্বিতীয়বারে মত লেখালেখির শুরুটা সে আসলে কখনই করতে পারবেনা !
প্রায় দুই বছর আগে ছেড়ে দেয়া লেখালেখিটা যে শত    চেষ্টাতেও এর আগে শুরু করতে পারেনি !
কে জানে কেন , স্রষ্টার ইচ্ছা ছিল নিশ্চয় , এইবার সে পেরেছিল ।
প্রায় সাত দিনের চেষ্টাতে একটা ছোটো গল্প লিখেছিল । নাম,নায়িকা,মেইন ক্যারেক্টার সবই রিমি !
কেন রিমি মেয়েটাই গল্পের সবকিছুতে ছিল,কেন তাকেই গল্পের নায়িকা বানিয়েছিল সেটা পরে            অনেক ভেবেও বের করতে পারেনি রাহাত !
হুট করে মাথায় এসেছিলো নাকি অনেকদিনের অনভ্যাসে কোনো ক্যারেক্টার মাথায় আসছিল না তাই অবচেতন মনের প্রথম নামটাই সে বেছে নিয়েছে সেইটাও একটা রহস্য ।
একটা ব্যপার অবশ্য ছিল , রিমি নামটা রাহাতও নিজের খুব পছন্দের ছিল , অসম্ভব পছন্দের !
নামটার মাঝে কিছু একটা ছিল , কিছু একটা যেটা রাহাত কে আকর্ষণ করত চুম্বকের মত ।
গল্পটার নাম কিংবা মেইন ক্যারেক্টার রিমির নামে হলেও আসলে সমস্যা ছিলনা খুব একটা , সমস্যা ছিল পুরো গল্পের মেইন ক্যারেক্টারের বর্ণনাতেও রাহাত আসলে রিমাকেই কল্পনা করেছে ।
তাকেই চোখের সামনে রেখে সে পুরো গল্পটা লিখেছে ! সেই কল্পনাতেও একটা খুঁত অবশ্য ছিল , মেয়েটার গালে আসলে টোল পড়তনা কখনই । সেটা অনেক পরে আবিষ্কার করেছিল রাহাত!
তবু রাহাতের কল্পনাতে সেই খুঁত এখনও আছে । রাহাত সেটা কোনোদিন পরিবর্তনের চেষ্টা করেনি ,করবেও না ।
খুঁত সহ কিছু কল্পনা থকতে হয় , কল্পনাটুকুতে খূঁত থাকতে পারে , কিন্তু রাহাতের সুখটুকু ছিল নিঁখুত ,এক্কেবারে নিঁখুত !
গল্পটা লিখতে লিখতেই রাহাত আবিষ্কার             করেছিল ওর বুকের বাম পাশটায় গেঁথে যাওয়া             রিমি নামটার কথা , নামটার পেছনে লুকিয়ে             থাকা একটা মানুষের কথা !
তার মনের অনেক  অংশ জুড়েই তখন কেবল রিমি নামের বাচ্চা একটা মানুষের আনাগোনা ।
ছুটে বেড়াতে থাকা সেই বাচ্চা মানুষটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই রাহাত প্রথমবারের মত অনুভব করেছিল,সুখ সুখ অনুভূতিটা ।
সেই পরবাস্তব সুখ সুখ অনুভূতিটার টানেই কিনা কে জানে,প্রতিদিন রিমির ওয়ালে ঢুকে ওর ছবির দিকে সম্মোহিতের তাকিয়ে থাকাটা  রাহাতের কাছে নেশার মত হয়ে গেছিল !
রিমি নামটা কিংবা রিমি মেয়েটার অথবা দুটোরই কি তীব্র নেশাতেই না ডুবেছিল রাহাত !
সেই নেশার ঘোরে প্রতিদিন রাতে নীল সাদা দুনিয়ায় সম্মোহিতের মত অপেক্ষা করত সে !
মাঝে মাঝে কথা বলার চেষ্টা করে দেখেছে ,পাত্তা পাইনি খুব একটা !
বেশিরভাগ দিন ম্যাসেজ সিন হইত বাট রিপ্লাই আর পাওয়া হতোনা !
যে দুই একবার ম্যাসেজ সিন করে রিপ্লাই দিয়েছিল , তখনই কথায় কথায় শুনেছিল , মেয়েটা গান করে !      রাজ্যের জড়তা আর ভয় নিয়ে রাহাত বলেছিল ,শুনাইও একদিন তোমার গান, কেন আমার গানই শুনতে হবে,কেন ! ?
নেশা যখন হয়েইছে,সবদিন দিয়েই হোক !
বলেছিল রাহাত।
কিভাবে এতটা নেশা রাহাতের হয়েছিল ,কিভাবে মেয়েটা তার অস্তিত্বের মাঝে ঢুকে গেছিল সেটার আগে পরে অনেক গল্প ছিল !
সেসব না হয় আজকে থাক ,উপন্যাস হয়ে             যাবে প্রায় !
সেই নেশাগ্রস্ত চোখে , সম্মোহিত কল্পনায় দিনের পর দিন পার হয়েছে , রাহাত শুধু রিমির নেশাতেই ডুবেই গেছে , আরো গভীরে , আরো গভীরে ।
সেমিস্টার পরীক্ষা হয়েছে , নতুন সেমিস্টারের ক্লাস ও শুরু হয়েছে , শুধু নেশাটার হেরফের হয়নি এতটুকুও। তারপর হুট করেই যেদিন ক্যাম্পাসের সবচেয়ে  উচ্ছন্নে যাওয়া , ভীষণ প্রতিভাবান ছেলেটা ক্যাফের বারান্দায় হাঁটতে হাঁটতে আনমনে  বলেছিল অ!
ওই মেয়ের তো বয় ফ্রেন্ড  অনেকগুলো পরিচিত মুখের ভীড়ে  কথাটা রাহাত শুনেছিল,ভীষণ নিস্পৃহ ভঙ্গিতে।
অনেকগুলো কাজ হাতে নিয়ে বের হওয়া দিনটাতে জ্বরের উছিলায় কিছু না করেই হলে ফেরত গেছিল রাহাত !
আকাশে তখন মেঘ ছিল ,জমাট বাঁধা কাল রঙের মেঘ ।
স্রষ্টা প্রকৃতির রঙ কে কিভাবে কিছু কিছু মানুষের খুব কাছাকাছি নিয়ে আসেন সেইটা রাহাত কোনোদিনও বুঝতে পারেনি !
উড়ন্তভাবে শুরু হওয়া ভার্সিটি জীবনটা আসলে রাহাতের থেমে গেছে ওখানেই !
বিষণ্নতাটুকু সঙ্গী হয়েছে নিয়ম করে !
গিটারের তারে মাইনর কর্ড গুলোই বেজে যায় প্রতিনিয়ত !
সবচেয়ে প্রিয় মানুষগুলোর সঙ্গও হাসাতে পারেনা অনেকদিন !
মা যেন বুঝতে  না পারে সেজন্য নিজের সাথেই অভিনয় করে যেতে হয় প্রতিনিয়ত !
সেই আমি আগের আমিই আছি সেটা বুঝানোর জন্য বাসায় থাকার প্রতিটা মুহূর্তে ঠোঁটের পাশে এক চিলতে  হাসি ধরে রাখে রাহাত !
মা তো , হাসির পেছনের বিষণ্নতাটুকু টের পেতে সময়  লাগেনা খুব একটা !
তবুও স্বীকার করা হয়ে ওঠেনা রাহাতের !
শুধু ধীরে ধীরে নিজের ভেতরের যন্ত্রনাটুকু বাড়তে থাকে তার !
সেই  যন্ত্রনাটুকু বুকে নিয়ে এখনও প্রতি রাতে রিমির ছবিগুলোর দিকে অপলক তাকিয়ে  থাকে রাহাত !
সে দৃষ্টিতে আজও নেশা থাকে,সম্মোহনের নেশা! শুধু অনুভূতির জায়গাতে বিষন্নতাটাও মিশে যায় , শেষ প্রহরের বিষণ্নতা...

Comments

Popular posts from this blog

অপূর্ব সত্তিকারের ভালোবাসা/valobasar golpo

প্রতিধন্ধী ভালোবাসা/valobasar golpo